প্রতিভাPROTIBHA

প্রতিভার পক্ষ থেকে

আহ্বায়কের কথা

সাতাশ বছর আগের কথা— ১৮-১৯ বছরের একঝাঁক স্কুল-কলেজ পড়ুয়া তরুণ তরুণী আর তাদের কিছু অনুজপ্রতিম ভাইবোন মিলে স্বপ্ন বুনেছিল এই মফস্বলের বুকে। উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার— সমসাময়িক রুচিশীল সাংস্কৃতিক স্রোতকে চেনা শহরের অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে দেওয়া, আর নিজেদের সামর্থ্যকে একটু একটু করে প্রসারিত ও প্রতিষ্ঠিত করা। বেকার জীবনের অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তিবিদ্যা পাঠ, টিউশনের দৌড়ঝাঁপ কিংবা সদ্য ব্যবসায়ে পা রাখার ছটফটানি— কোনো কিছুই সেই এক অমোঘ আকর্ষণের ঠেককে থামাতে পারেনি।

তারপর দিন গড়িয়েছে। নদীর প্রবাহের মতো সেদিনের সেই দামাল দলটা জীবিকার তাগিদে ছড়িয়ে পড়েছিল কাছে দূরে বহুদূরে। কিন্তু শিকড়ের টান ? আজ কেউ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ে, প্রযুক্তি ক্ষেত্রে, সংবাদজগতে, সৃজনশীল ক্ষেত্রের মূলধারায়, সুরের ভুবনে, রাষ্ট্র সুরক্ষার গুরুদায়িত্বে কিংবা সারস্বত সাধনায় আবার তরুণতর অনুজ প্রজন্মের অনেকেই সাফল্যের খোঁজে জোরদার লড়াই জারি রেখেছে। আমরা বিশ্বাস করি তাঁরাও প্রতিষ্ঠিত হবেই। সময়চক্রে সেদিনের সেই রোদবৃষ্টি সামলানো দামালদের অনেকেই আজ দায়িত্বশীল অভিভাবকও। বন্ধুদের ভাই বোনদের কর্মক্ষেত্রের নানাবিধ সাফল্য এবং সংগঠনের প্রতিটি সদস্য-সদস্যার সংস্কৃতি চর্চার, নান্দনিক জগতের বিবিধ ক্ষেত্রে প্রাপ্ত সাফল্য আজও আমাদের সমান আনন্দ দেয়— সংগীতে আমাদের অনুজ সদস্যের ‘রাষ্ট্রীয় পুরস্কার’ জয় বা অন্যান্য সঙ্গীদের অর্জন কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের এক একটি নতুন সাফল্য আমাদের মনকে ভরিয়ে তোলে আত্মতৃপ্তিতে। তারই মধ্যে অকালপ্রয়াত সপ্তর্ষিদা, বন্ধু প্রিতম, সাত্যকি, অনিন্দ্য, বোন সোমাকে আজও স্মরণ করি বন্ধুত্বে তো বটেই সংস্থাগত অবদানেও।

এই ‘অ্যান্ড্রয়েড’ যুগের তীব্র আলোছায়াপর্দায়, গেম আর রীলসে মত্ত আগামী প্রজন্ম বা স্কুল জীবন, কেরিয়ার নিয়ে তীব্র চাপের সামনে থাকা সন্তান সন্ততিদের দেখে মনে হয়েছিল — প্রযুক্তি বন্ধু হোক, কিন্তু তার পাশাপাশি সেই পুরোনো মননশীল গোষ্ঠী-সংযোগটা যা মানুষের প্রধান শক্তি তাকে তো হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না! সেই লক্ষ্যেই আবার এই যূথবদ্ধ হওয়া। আজও স্মৃতির পর্দায় ভেসে ওঠে— কুড়ি-বাইশের সেই উচ্ছ্বল বয়সে সীমিত পকেট মানি বাঁচিয়ে স্রেফ বন্ধুত্বের ভরসায় যারা এ শহরের স্কুলবাড়ি কিংবা চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহে চন্দ্রবিন্দু বা রূপঙ্করের একক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল, তারাই তো মিলেনিয়াম বন্যার প্লাবিত বিদ্যুৎহীন অন্ধকার শহরের শারদ সন্ধ্যায় প্রকাশ করেছিল আমাদের এই লিটল ম্যাগাজিন 'প্রতিভা'! আগমনী মণ্ডপ ঘিরে লিটল ম্যাগাজিনের স্টল আর প্রেস থেকে আনা নতুন বইয়ের গন্ধ একদিন তো এই শহরেরই নিজস্ব পুজো ‘সিগনেচার’ হয়ে উঠেছিল। হঠাৎ করেই তা হারিয়ে গিয়েছিল কিছু মাস দিন বছরের জমানো ক্যালেন্ডারের পাতায়।

স্ক্রিন বনাম কাগজের বইয়ের এই জোরদার লড়াইয়ে আমরা কাগজ-কালির পক্ষেই থাকছি আবারও। মাস দেড়েক আগে, প্রায় ষোলো-সতেরো বছর পর, শহরের পৌর অডিটোরিয়ামে আমাদের 'প্রতিভা'র সেই ছোট্ট রিইউনিয়নটা নতুন করে উসকে দিয়ে গেল পুরনো প্রদীপের সলতেটাকে। বিশ্বফুটবল নিয়ে কুইজ শেষে শহরের অন্যান্য সংগঠনের সাংস্কৃতিক বন্ধুদের নিয়ে স্মৃতির চেনা সরণিতে পদসঞ্চারণ সেদিন আরও একবার বুঝিয়ে দিয়েছিল— ফিরে আসার ভালোবাসার টান কতটা তীব্র অথচ ফল্গুধারা হয়ে বইছিল আমাদের প্রতিভার সব্বাইয়ের ভেতরে, প্রত্যেকের অন্তরে।

খুব স্বল্প সময়ের সিদ্ধান্তে প্রকাশিত হচ্ছে ‘প্রতিভা’-র এবারের সংখ্যা। তাই আমাদের আর্কাইভের কিছু জরুরি লেখাপত্তরের সঙ্গে নতুন কাহিনি, গদ্য, কবিতা ও প্রবন্ধের পাশাপাশি এতে স্থান পেয়েছে এই বছর শতবর্ষস্পর্শী বা পেরোনো বা শতবর্ষাধিক প্রাচীন ক্ষণজন্মা বাঙালি প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলি নিয়ে কয়েকটি বিশেষ লেখালেখি। সময় কম থাকায় মুদ্রণ বা অন্য কোনো ভ্রান্তি থাকলে ক্ষমার চোখে দেখার অনুরোধ রইল।

আপনাদের অকৃত্রিম প্রশ্রয়েই তো এই প্রান্তিক সীমান্ত শহরের সাংস্কৃতিক মহল্লা-গলিতে সাতাশটি বছর পার করলাম। আবারও শিউলি ঝরা ভোরে, আলোয় মোড়া শারদ সন্ধ্যায় প্রকাশিত হলো এবারের ‘প্রতিভা’। ভালোবাসা সঙ্গী হোক। বিশ্বাস রাখি— দেখা হবে আবার, বারবার...


অভিজিৎ পাল

জয়দীপ পালিত

যুগ্ম আহ্বায়ক

প্রতিভা

২০২৬