আমার আকাশবাণী ও কিছু মুহূর্তরা
— শম্পা দে
প্রতিভা ব্লগএক একটা সকাল শুরু হয় একেক সুরে। কোনোটায় আনন্দলহরী বাজে, ঘুমটুম এক ছুটে হাওয়া। কখনো ভৈরবীর জায়গা বদল করে ইমন। বুঝতে পারি সন্ধ্যা নামে মনের গা বেয়ে। কিন্তু সে যাই হোক, খেয়েদেয়ে ছুটে ছুটে স্কুলে পৌঁছেই বসে পড়ি রুটিনের তানপুরা নিয়ে। তারা মুদারায় বাজতে থাকে হৃদয়ের সুর। জীবনের তার ছুঁয়ে বেজে ওঠে আনন্দরাগিনী।
দশটা চল্লিশ— সাড়ে চারটের সকালটা শুরু হয় প্রার্থনা সভায়। নানা রকম ঘোষণা, দিনের তাৎপর্য আলোচনার শেষে সমবেত কন্ঠে শুরু হয় জাতীয় স্তোত্র। ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের মানসদা মোবাইলে বাজান বন্দেমাতরম-এর প্রিলিউড। ঠিক যেটা বাস্তব আমার ঠাকুরদার রেডিওতে ভোরের বেলা। চোখ থেকে সরে যায় চশমা আর মন থেকে বয়সের ভার। আমি উঁকি মারি। অতীতটা ঝুপ করে নেমে আসে স্কুলের আঙিনায়।
আমাদের শৈশবের সকালটা শুরু হতো রেডিও থেকে ভেসে আসা একটা অদ্ভুত সুন্দর সুরে, আর তারপরই হতো "চাষি ভাইদের বলছি"। শুনেছি ঠাকুরদাদার বাবা এ দেশেই সরকারি চাকুরে ছিলেন, আমার ঠাকুর দাদাও। তবুও কোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ঠাকুরদা চাষি ভাইদের বলছি শুনতেন সেটা আজও ভাবি। হয়তো লাঙল আর মাটির সাথে কৃষকের আজীবনের টান রয়ে যায়। দেশভাগের ছুরি তার নাড়ীটা কেটে দিলেও রক্তমাংসের মধ্যে দিয়ে নিরুচ্চারে বয়ে যায় "দ্যাশের টান"।
সেই শুরু আমার রেডিওর প্রতি প্রেম। শুধু রেডিও না, বলা ভালো শব্দের প্রতিও। খবর থেকে গান, নাটক থেকে বিচিত্র সংবাদ– এসব কিছুর সাথে সাথে আমার কানটা তৈরি হতে থাকে, মনও। আসলে প্রতিটি তৈরি হওয়ার ক্ষেত্রে ছাঁচটা খুব জরুরি। আমার বাবা খুব ছোট থেকে নানান বই এনে দিতেন আমায়। প্রথমে ছবির বই তারপর যথারীতি ছাপার। ছাপার শব্দের সাথে রেডিওর মেলবন্ধনে ক্রমে ক্রমে শব্দই কাছের হয়ে উঠতে থাকে আমার কাছে, বিশ্বস্ত এবং বন্ধু। যাকে বলে ব্রহ্ম।
সম্ভবত যখন সিক্স কিংবা সেভেনে পড়ি, টিভি এসেছিল আমাদের বাড়ি। শনিবারের বাংলা ছবি, বুধবারের "চিত্রহার", বৃহস্পতিবারের "চিত্রমালা"য় তেমন আপত্তি ছিল না বড়দের। তবে বড় হওয়ার সাথে সাথে রবিবারের সকালের "মহাভারত" আর রাতের "সুপারহিট মুকাবিলা"র টান ছিল খুব। প্রথমটাতে অবাধ ছাড় থাকলেও পরেরটা ছিল নিষিদ্ধ। তবে এসব কিছু ছাপিয়ে আমার মনে স্থায়ী জায়গা করে নিচ্ছিলেন দেবাশিস বসু, ছন্দা সেন, তরুণ চক্রবর্তী, চৈতালি দাসগুপ্ত, শাশ্বতী গুহঠাকুরতা, মধুমন্তী মৈত্র, রায়া ভট্টাচার্যরা। গোপনে গোপনে শব্দ, তার ব্যবহার, প্রক্ষেপণ, ওঠানামা আমার বেড়ে ওঠায় জায়গা করে নিতে থাকলো প্রবল ভাবে।
সালটা সম্ভবত ১৯৯৯। তখন আমরা ওপারে পাল পাড়ায় থাকতাম রমেশ জ্যেঠুদের বাড়ি। আমার রেডিও প্রীতির কথা জানতো বন্ধুরা। জানতো আমার বিভিন্ন জায়গায় সঞ্চালনা করার কথাও। ততদিনে "প্রাত্যহিকী"তে আমার লেখা তিনটি চিঠি পড়া হয়ে গিয়েছে। বিষয় ছিল বর্তমান প্রজন্ম ও রবীন্দ্রনাথ, স্বাধীনতার সুখ, চাবি। দেবাশিস রায়চৌধুরীকে আমি সেখানেই চিনি– সৌভাগ্য ক্রমে যিনি এখন আমার স্নেহময় দাদা। সেই সময়েই আমার এক বন্ধু দেবাশিস খবরটা দেয় আমাকে, আকাশবাণীর এফ এম চ্যানেলের উপস্থাপক নেওয়া হবে। আমিতো যারপরনাই দারুণ খুশি। আবেদন করে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। যথারীতি সিলেক্টেড হওয়ার পর লিখিত পরীক্ষার জন্য এডমিট কার্ড এল। আমার ছোটো পিসেমশাই নিয়ে গেলেন আমাকে পরীক্ষা দিতে। আশ্চর্যের বিষয় আমি উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিলাম সেই পরীক্ষায়। এবার আমাকে আর পায় কে! লাফাতে লাফাতে গেলাম ইন্টারভিউ দিতে। আকাশবাণীতে সেই আমার প্রথম প্রবেশ, আমার স্বপ্নের মুখোমুখি! ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম ভালোই। কিন্তু "যে টেলিফোন আসার কথা আসেনি.."
সেই স্বপ্নভঙ্গ আমাকে দমিয়ে দেয়নি, বরং আমার জেদ বাড়িয়ে দিয়েছিল ভীষণভাবে। এরপর থেকে রেডিও শুনতাম নিয়ম করে, পড়াশুনোর ফাঁকে ফাঁকে। কর্মক্ষেত্রে খুঁজতাম কবে আবার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। একটা সুবিধা হয়েছিল যে ওই সময় বি.এড পড়ার সাথে সাথে আমি চাকরির জন্যও লেখাপড়া শুরু করেছিলাম ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের অনেকটাই আমার চেনা হয়ে গেছিল।
২০০১ এ যখন আবার বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় আকাশবাণী কলকাতার এফএম বিভাগের উপস্থাপক নেওয়া হবে বলে, আবার আমি আবেদন করি নতুন উদ্যমে। এবারেও নির্বাচিত হওয়ার পর লিখিত পরীক্ষা। সিট পড়েছিল হিন্দু স্কুলে। তখন আকাশবাণীর স্টেশন ডিরেক্টর ছিলেন অমিত চক্রবর্তী। তাঁর "মনের কাছাকাছি" অনুষ্ঠানের নিয়মিত শ্রোতা ছিলাম আমি। পরীক্ষা কেন্দ্রে সম্ভবত পরিদর্শনে গেছিলেন তিনি, গলা শুনেই চিনতে পেরেছিলাম তাঁকে। সেই চেহারা এখনো মনের মাঝে ছাপ ফেলে আছে। যদিও পরে তাঁকে সামনাসামনি অনেকবার দেখেছি। প্রশ্নপত্রে mcq এবং রচনাধর্মী দু ধরনের প্রশ্নই ছিল। তার মধ্যে একটি ছিল আমার প্রিয় দশটি উপন্যাসের তালিকা এবং প্রিয় চরিত্রের আলোচনা। মনে পড়ে প্রিয় চরিত্র হিসাবে আমি লিখেছিলাম কালবেলার 'মাধবীলতা'র কথা। এবারেও ডাক পেলাম আবার। ইন্টারভিউ দেওয়ার সময় আমার জুটি ছিল বারাসাতের সোমা , সোমা সরকার। মজার বিষয় এই যে, রেজাল্ট বেরোলে দেখা গেল যে আমরা দুজনেই হার্ডলস টপকে গেছি বেশ ভালোভাবে। সেই শুরু। আকাশবাণী কলকাতা এফএম ২০০২ এর ব্যাচ, এই পরিচয়েই তৈরি হলো আমার নতুন পৃথিবী। সে পৃথিবী আমাকে শুধু শব্দ নিয়ে খেলতে নয়, শব্দকে ভালবাসতে, বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে, শব্দের মাধ্যমে নিজেকে শ্রোতার মনের মধ্যে সোজা হয়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছে। এখন আমি ইডেন গার্ডেন্স আর নেতাজি ইনডোরের মধ্যবর্তী ওই বাড়িটায় থাকি বা না থাকি তাতে তার কিছু আসে যায় না কিন্তু ওই বাড়িটা চিরকালের জন্য আমার মনের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে পাকাপাকি।
আকাশবাণী এফএম ২০০২-এর ব্যাচে একঝাঁক নতুন ছেলেমেয়েরা। বেশিরভাগই তখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। আমি পড়ছি কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে। যদিও সিনিয়র কেউ ছিলেন। আমাদের বন্ধুত্ব হয়েছিল খুব তাড়াতাড়ি। এর মধ্যেই চলছিল বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পর্ব। কোন অনুষ্ঠানে কী বিষয় নির্বাচন করতে হবে, কীভাবে বিষয় সাজাতে হবে, গানের ব্যবহার করব কীভাবে, শ্রোতারা ফোন করলে সেটা রিসিভ করা বা তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এসব বিষয় শিখছিলাম। বাইরের কোনো অতিথিকে অনুষ্ঠানের ফোনের মাধ্যমে আনতে গেলে কীভাবে আনা সম্ভব সেটাও ছিল একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মাইক ও কনসোল ও শব্দের ব্যবহার। কারণ আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, সমস্ত সম্প্রচারটাই হবে আকাশবাণী কলকাতা থেকে এবং এটি সম্পূর্ণ সরকারী বেতার মাধ্যম। কোন ভুল শব্দ, ভুল তথ্য, অশালীন কোনো শব্দ, অপ্রাসঙ্গিক কোন কথা এসব কিছুই যেন না থাকে। সব থেকে বড় কথা সম্প্রচার কখনো থেমে থাকবে না। ফলে অনুষ্ঠান চলাকালীন তটস্থ হয়ে থাকতাম। মনের মত বিষয় থাকলে উপভোগ করতাম খুব কিন্তু ভিতরে ভিতরে প্রস্তুতি নিতাম পরবর্তী মুহূর্তটির জন্য। Announcement, Presentation এবং News reading এর মধ্যেকার পার্থক্য গুলোও শিখতে হয়েছিল আমাদের। এভাবেই আকাশবাণী প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, আন্তরিতা, দায়বদ্ধতা তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়ে বড় করে তুলেছিল মফস্বলের একটা মেয়েকে।
যাই হোক, এর মধ্যেই ২৬ অথবা ২৭ মার্চ ২০০২ আমার প্রথম অনুষ্ঠানের ডেট পড়ল। প্রসঙ্গক্রমে জানাই, মাসের প্রথমেই সবাইকে সারা মাসের ডিউটি চার্ট দিয়ে দেওয়া হতো। ২৪ ঘন্টাই ছিল ডিউটি আওয়ার। যার যখন থাকতো সেই অনুযায়ী সে প্রস্তুতি নিতো। ভোরের বেলা বা রাতের বেলা ডিউটি থাকলে অফিসের গাড়ি আমাদের নিয়ে যেতো এবং দিয়ে আসতো। আমি থাকতাম সল্টলেক আমার ছোট পিসির কাছে। কখনো কখনো দমদমে আমার মামীর কাছেও থেকেছি। যে যেখানেই থাকি না কেন কোথা থেকে গাড়িতে উঠবো বা নামবে সেই রিকুইজিশন অফিসিয়ালি অনেক আগেই জমা দিতে হতো। গোটা ব্যাপারটাই ছিল খুব নিয়ম-নিষ্ঠ। ঠিক যেমন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হতো লাইব্রেরির ক্ষেত্রে। আমার সৌভাগ্য হয়েছে আকাশবাণীর বুক-লাইব্রেরি এবং ডিস্ক-লাইব্রেরি ব্যবহার করার। কোন বিষয় নিয়ে জানার থাকলে বা পড়ার থাকলে সোজা চলে যেতাম তিনতলায় লাইব্রেরিতে। পড়াশুনা করে নোট নিতাম, তৈরি হতাম অনুষ্ঠানের জন্য। সম্ভবত কোনো বই কোনোদিন বাড়ি নিয়ে আসিনি। ডিস্ক-লাইব্রেরি ছিল খুব মজার জায়গা। সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য সবাই কমবেশি সংগ্রহ করতে যেতেন। EP, LP, Record, CD-র সম্ভার ছিল সেখানে। প্রয়োজন অনুযায়ী রিকুইজিশন জমা দিয়ে এইসব সংগ্রহ করে নিতাম আমরা। অনুষ্ঠান শেষে লিস্ট মিলিয়ে সবকিছু জমা দিতে হতো ডিউটি অফিসে। লাইব্রেরির জলি (ব্রহ্ম) দিদির হাসিখুশি মুখ এবং কোথায় কোন গান খুঁজে পাবো সেই সাজেশন এখনো মনে পড়ে। এই ডিস্ক-লাইব্রেরিতেই আমার আলাপ হয় আমাদের তাপসদার সাথে, বনগাঁর তাপস বিশ্বাস। আমি জানতাম তাঁর কথা। তাপসদা আগেই যুববাণীতে কাজ করতেন এবং ২০০২ এ আমাদের সাথে এফ এমে যোগ দিয়েছিলেন। বনগাঁ শুনে স্বাভাবিকভাবেই আমার প্রতি একটা স্নেহের টান তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আমাদের কখনো একসাথে ডিউটি পড়েনি। যদিও বনগাঁতে আমরা অনেকবার একসাথে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেছি এবং ভাবতে ভালো লাগে যে আমাদের কখনোই মাইক নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে হয়নি।
আমার প্রথম অনুষ্ঠানের বিষয় ছিল "গতিহারা ইছামতি"। বনগাঁর মেয়ে বলে আমাদের প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ অরুনাভদা (অরুনাভ রায়) এই বিষয়টি আমাকে নির্বাচন করে দিয়েছিলেন। সাথে ছিলেন আমার সিনিয়র অর্পণদা, অর্পণ কুমার শর্মা। এখন তো রেডিও, টিভি বা বিজ্ঞাপনে অর্পণদা খুবই পরিচিত কন্ঠ। রেডিওতে উপস্থাপনার প্রতিটি খুঁটিনাটি খুব যত্ন করে শিখিয়েছিলেন অর্পণদা। মনে পড়ে, বাবার সাথে কলেজ ঘাটে গিয়ে এক সন্ধ্যায় নৌকায় বসে একজন মাঝির সাক্ষাৎকার পকেট টেপরেকর্ডারে বন্দি করে এনেছিলাম। সেই মাঝি ছিলেন দৃষ্টিহীন আর পকেট টেপরেকর্ডারটি ছিল অর্পণদার। আকাশবাণী আমাকে শিখিয়েছে একটি অনুষ্ঠান মানে শুধু আমি নই, আমার চারপাশের সবকিছু মিলিয়েই একটি বিষয় সুচারু হয়। সময়, ধৈর্য, নিষ্ঠা, সততা, পড়াশুনোর গভীরতা, আন্তরিকতা এই সব কিছুই প্রয়োজন সুন্দর উপস্থাপনার জন্য। যেকোনো অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেই এ কথাটি প্রযোজ্য। যদিও আমি তার কতটুকু মেনে চলতে পারি তা বলতে পারি না। যাদের কথা না বললে আমার এই শিক্ষা অসম্পূর্ণ রয়ে যায় তাঁরা হলেন পার্থ ঘোষ, গৌরী ঘোষ, স্বাতী চট্টোপাধ্যায় দাস, অরুনাভ রায়, মিতালী দত্ত, শোভন পাঠক, দেবাশীষ বসু, ছন্দা সেন, সৌমিত্র বসু, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, মানস প্রতিম দাস, সিদ্ধার্থ দাশগুপ্ত, মলয় ঘোষ, সোনালি ভট্টাচার্য, কৃষ্ণকলি চক্রবর্তী, রত্না মিত্র আরো অনেকে। আমি কৃতজ্ঞ তাঁদের কাছে। আমার বন্ধুরা যারা কলকাতায় এবং কলকাতার বাইরেও ছিলাম তারাও বেঁধেছিলাম একসাথে এক অদৃশ্য বাঁধনে। তাঁদের মধ্যে এখনো যোগাযোগ আছে দীপ্ত প্রকাশ (চক্রবর্তী), সুদীপ (বসু), লেনা (দাশগুপ্ত), ইন্দ্রানী (হালদার), সোমার(সরকার) সাথে। বন্ধুদের কথাতেই বলি যে ২০২৪ শে তিলোত্তমার ঘটনায় সরব হয়ে বিখ্যাত হয়েছেন হাওড়ার তারা সুন্দরী বালিকা বিদ্যালয়ের বড়দি ডঃ মোনালিসা মাইতি, সেও কিন্তু আমার রেডিওর বন্ধু মোনালিসা। আর ব্যক্তিগতভাবে যারা না থাকলে এই পথটাই আমি চলতে পারতাম না তাঁরা হলেন আমার মা বাবা এবং ছোট পিসি আর পিসেমশাই। রেডিওতে কাজ করতে গেলে কাছাকাছি থাকাটা একটা অন্যতম শর্ত। সেই শর্তপূরণে আমাকে সব রকম সহায়তা দিয়েছিলেন আমার পিসেমশাই। আরেকজন ছিলেন আমাদের অফিস স্টাফ দীপকদা। দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে আসা এই মানুষটি অফুরান স্নেহ করতেন আমাকে। দূর থেকে যাতায়াত করতাম বলে অনেকদিন ক্যান্টিন থেকে কুপন তুলে রাখতেন আমার জন্য। নাইট ডিউটি থাকলে খাবার কিনে রাখতেন। এই স্নেহ তো ভোলার নয়!
২০০৬ এর মার্চেই আমি শেষ অনুষ্ঠান করেছি আকাশবাণীতে। না, কোন রেজিগনেশন লেটার দিইনি। কিন্তু এস এস সি-তে উত্তীর্ণ হয়ে আমার শিক্ষকতার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ওই মার্চ মাসেই। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, স্কুল , বাড়ি আর রেডিও আমার পক্ষে একসাথে সামলানো সহজ কথা নয়। ফাঁকিবাজিটা রপ্ত করতে পারলে হয়তো অনেক কিছু একসাথে করতে পারা যায় কিন্তু সে বিশ্বাস আমার ছিল না। তাই অনেক কষ্ট বুকে নিয়েই দরজাটা আমি নিজের হাতে বন্ধ করে দিয়েছি। এর সব দায়টুকুই আমার একান্ত। তবুও আমার বন্ধুরা, সিনিয়াররা, আমার শ্রোতাবন্ধুরা বিশেষ করে হাওড়ার সব্যসাচী বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো মাঝে মাঝে স্মৃতির হাত ধরে পৌঁছে দেন আকাশবাণীর দোরগোড়ায়। আমি দূর থেকেই ছুঁয়ে দেখি আমার 'আশ্চর্য প্রদীপ'কে।
ধরার আঙিনা হতে ওই শোন উঠিল আকাশবাণী।
অমর লোকের মহিমা দিল যে মর্ত্যলোকেরে আনি।
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, "স্ফুলিঙ্গ"
বাংলা তথা ভারতের সমাজ-সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে থাকা এই বাড়িটি, আমাকে গ্রহণ করেছিল পরম স্নেহে। অতীতের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির আলো মাখার সে সৌভাগ্য আমার আজীবনের। বড়দের শাসন, স্নেহ পা ফেলতে শিখিয়েছিল এক জীবন থেকে আরেক জীবনে। সেই বাড়ি, স্টুডিওর রূপকথা, রবি ঠাকুরের উপস্থিতি, লাইব্রেরির নৈঃশব্দ, কনসোল, মাউথ পিস, লং প্লেয়িং রেকর্ডেরা আমাকে ডাকে, ডাকে শব্দের ঠিকানায়। আমার ভিতর থেকে বেজে ওঠে জীবন খোঁজার গান। গত ২৬ আগস্ট ১০০ বছরে পা রেখেছে "আকাশবাণী কলকাতা"। আমি না থেকেও থেকে যাব এই আনন্দ আশ্রমে।